স্বপ্ন পূরনের আশায় আহছানউল্লাহ নামক এক সুতীক্ষ্ণ বাঁশ বাগানে এসে পড়েছি || জীবন থেকে নেয়া

জীবনের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেবার জন্য গেলাম রাজশাহী।অসাধারন মুহূর্ত।দুটো ইউনিটে পরীক্ষা দিলাম। সৌভাগ্য নাকি দূর্ভাগ্য তা বলা মুশকিল। দুটোতেই ফেল করি স্বসম্মানে।

কি আজব তাইনা?? যে ছেলে এস.এস.সি তে ও এইচ এস সিতে গোল্ডেন A+ পাইছে সে ছেলে কিভাবে ফেল করে?আমি একটা  নজির রেখে গেলাম হয়তো, আমার মতো খারাপ ছাত্র যখন আকাশচুম্বী  রেজাল্ট করে তখন অগ্নিপরীক্ষায় গিয়ে মারা খায়!!!!
এরপর  পাড়ি জমালাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। সে এক দূর্বিসহ যাত্রাপথ। আমরা রাজশাহী  গিয়েছিলাম পাঁচজন। তাদের মাঝে চারজন বাসের টিকিট কাটলো কিন্তু আমি কাটলাম না।আমার বড় দুলাভাই নাকি ট্রেনের টিকিট কাটবে। ট্রেনে যাবো। ভাল লাগতো যদি বন্ধুদের সাথে যেতে পারতাম।অবশেষে ট্রেনের কাছে গিয়ে হতবাক হতে হয়েছিলাম।একি দৃশ্য!!! আমরা আমাদের সিট তো দূরের কথা ট্রেনের ভিতরেই ঢুকতে পাচ্ছিলাম না। কি বিপদরে বাবা!!!
অতপর, এক লোক, অবৈধভাবে অবস্থানরত ছাত্র গুলো টেনে টেনে বের করে দিলো। আমার সত্যি  খারাপ লাগতেছিলো। জ্ঞান  আরোহণেরর জন্য কতোটা ত্যাগ স্বীকার!!!  ভাবা যায়???
কোনমতে সিটে বসতে পেরেছিলাম বলে ঢাকা যাওয়াটা সম্ভব হয়েছিলো। নয়তো কিযে হতো আল্লাহ ভালো জানেন। ঢাবির প্রশ্ন  সম্পর্কে আমার যথেষ্ঠ সু ধারনা ছিলো। কারন,  একে তো ইন্জিনিয়ারিং কোচিং করেছিলাম আর একেতো ভাবতাম ঢাবির প্রশ্ন  সহজ  হয়।এটাই কাল হয়ে গেলো বৈকি??

এ ভাবনা মতো পড়ালেখাও করতে পারিনি।যাই হোক, ঢাবিতে পরীক্ষা দিলাম।কয়েকদিন  পর রেজাল্ট  ও পেলাম।প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম ৮৬ টা। সঠিক হয়েছিলো ৬০ টা। ভুল ২৬ টা!!!!! নাম্বার  পেলাম ৫৩। সিরিয়াল ১১৪০৮
মাথা পুরাই নষ্ট হয়ে গেলো। একি করলাম??? যে ঢাবিতে পড়ার এতো শখ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলাম সেই ঢাবিতে পড়ার সুযোগ পেলাম না। খারাপ লেগেছিলো। কষ্ট হচ্ছিলো অনেক। মনকে স্বান্তনা দেবার ভাষা পাচ্ছিলাম না। অন্ধকার কূপের ভেতর পরে ছিলাম মনে হচ্ছিলো। দুনিয়াটা কালো মনে হতে লাগলো।
এরপর চলে এলাম জাহাঙ্গীর নগরকে দর্শনের আশায়। এখানেও পড়ার ইচ্ছেটা জন্ম নিলো তখন। পরীক্ষা  দিলাম। ৬০ এর মাঝে ৪০ কি ৪২ টা দাগাইলাম। সময় শেষ। বুঝতেই পেলাম না। একে তো ৮ – ১০ মিনিট পরে হলে ঢুকলাম তার উপর টাইম ও পেলাম না। এটাও গেলো গেলো বলে আভাস পেলাম।সেদিন রাতেই রেজাল্ট  হলো। হাহ!!! কি আর বলি… সিরিয়াল এলো ৯০৪৫!!! কোপাও আমাকে। একি করলাম??আবার হতাশার চাদরে আবৃত্ত  হয়ে গেলাম। তখন ভেবেছিলাম,ইশশশ!! যদি সিরিয়াল টা ৯৪৫ হতো??? ভর্তি তো হতে পারতাম।নাকি?? সেটাও হলো না।
ঈদের আগে এই তিনটা জায়গা তেই পরীক্ষা  ছিলো। একটাতেও হলো না। ভেবেছিলাম ঈদ টা ভাল যাবে।  কিন্তু নাহ। ঈদ টাও মাটি।
ঈদের পর প্রথম পরীক্ষা  হয়েছিলো লোকাল বিশ্ববিদ্যালয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুটো ইউনিটে ফর্ম তুলেছিলাম। ডি আর ই ইউনিটে পরীক্ষা  দিলাম। ডি ইউনিটে ক্যালকুলেটর ইউজ করতে দেয় নি বলে মেজাজ খুব গরম হলো। রেজাল্ট  হলো কয়েকদিন পর। ডি ইউনিটে ২৩২ তম আর ই ইউনিটে ৩১৭ তম হয়েছিলাম।ডি ইউনিটে মেরিটে আর ই ইউনিটে অপেক্ষমান। কিছুটা হতাশা কেটেছে। পাবলিক কোন ভার্সিটিতে পড়বো এই ভেবে।
এরপর  গন্তব্য  বাকৃবি।আমি আশা করেছিলাম বাকৃবি তে চান্স  পাবো। কারন ব্যাকআপ  ২০০ ছিলো। কিন্তু কি হলো বুঝলাম না। এটাতেও হলো না। সিরিয়াল এলো ২৮৬০। অপেক্ষমান হয়ে থেকে গেলাম।
রুয়েটে পরীক্ষা  দিবো বলে  স্থির করলাম।প্রশ্ন খুব সহজ হয়েছিলো। কিন্তু লিখিতো কিছুই লিখতে পাচ্ছিলাম না। বইয়ের অংক হুবাহু তুলে দিয়েছিলো। কিন্তু নাহ, হচ্ছিলোই না। মাথা কাজ করা বন্ধ  হয়ে গেলো। চান্স  হয়নি। সিরিয়াল ২২৫০।
এরপর  মেডিকেল  এ দিলাম পরীক্ষা।  আমি কখনো দিতে চাইনি। আব্বা জোর করে দেওয়ালো। ওটাতেও হয়নি। সিরিয়ালটা নাই বা বলি। লজ্জা  পাচ্ছি  :p
বুয়েটে পড়ার ততোটা ইচ্ছা ছিলো না, তবে দেখার শখটা হয়েছিলো। শখের বসেই চলে গেলাম বুয়েটে। প্রশ্ন সেতো নাই বা  বলি। ভয় লাগেযে। কিভাবে যে টাইম টুকু পার করছি আমিই জানি। উফফফ। যে বাজে পরীক্ষা  দিয়েছিলাম তাতে চান্স  পাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। হয়ও নি সেরকম কিছুই। প্রায় এক মাস ব্রেক চলছে। পড়তেও মন চায়না। ওদিকে রোকেয়া ভার্সিটি তে পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। তাই টেনশন মুক্ত  ছিলাম।
হাজী দানেশে পরীক্ষা  দিবো কি দিবো না তা নিয়ে সংশয় এ ছিলাম। পরীক্ষার আগের রাতে ভাবলাম ফর্ম যখন তুলেছি দিয়েই আসি। গেলাম,  পরীক্ষা দিলাম। বাকীটুকু ইতিহাস। এটাও লজ্জার বিষয়।
প্রথমবার পরীক্ষায় বাবার অনেক টাকা খরচ করেছিলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিলো। যাই হোক, রোকেয়া তে এক মাস ক্লাস করলাম  শখের বশে। এরপর সেকেন্ড  টাইম প্রস্তুতি  নিলাম। ঢাবি এবার ও স্বপ্নের  জায়গাতেই রয়েছে।ঢাবিতে এবার সিরিয়াল এলো সাড়ে সাত হাজার এর কোঠায়। হলো না স্বপ্ন পূরন।
এক এক করে বাকৃবী, জাবিতে পুনরায় পরীক্ষা  দিলাম। আমি বুঝলাম না, এমন কেন হলো?? আমি কি এবার ও কোথাও চান্স  পাবো না?? এদিকে রোকেয়ার প্রতি আর কোন ফিল পাচ্ছিলাম না। আমাকে ঢাকা যেতে হবে। রংপুরে থেকে কোন লাভ নেই।
আগে থেকেই আহছানউল্লাহ এর নাম শুনেছিলাম।আস্তে আস্তে ইচ্ছে জাগতে শুরু হলো। কিন্তু  প্রাইভেট বলে কথা। কতো  টাকা!! অনেক টাকা লাগবে। তবুও বাবা রিস্ক নিয়ে নিলেন।
ফর্ম তুলে ফেললাম। চান্স  ও পেয়ে গেলাম। উল্লখ্য যে, তখন ভর্তি পরীক্ষার ব্যাবস্থা ছিলে না। যদি থাকতো তবে শিওর এটাতেও চান্স  পেতাম না। এতোটাই ডিপ্রেশনে ছিলাম। যাই হোক, ইলেকট্রিকালে ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন মনে হলো, নাহ এবার কিছু একটা  হবে। কিছুতো করতে পারবো জীবনে।

ভার্সিটি লাইফ শুরু হলো। জীবন আরো কঠিন হতে লাগলো। চাপ বাড়তে থাকলো। ডিপ্রেশন  এখন হয়।  এতো টাকা দিয়ে পড়ছি। চাকরী পাবো তো?? রেজাল্টের কথা আর নাই বলি, ভাগ্যের জোরে দুটো গোল্ডেন  পেয়েছিলাম। আর এখন স্বপ্ন  পূরনের আশায় আহছানউল্লাহ নামক এক সু তীক্ষ্ণ  বাঁশ বাগানে এসে পড়েছি। কিচ্ছু  করার নাই। জীবন এমন ই। কি হচ্ছে, কি হবে, কি হতে চলেছে কিছুর ই আন্দাজ  পাওয়া যায়না। জীবন চলে আপন গতিতে, আমরা হলাম দ্বিচক্রযান।

লেখক: মাহবুব সিয়াম
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s